
ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন। তিনি সম্প্রতি রাশিয়ার কাছে দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
গত শুক্রবার রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভের সঙ্গে বাগ্যুদ্ধে জড়ান ট্রাম্প। এর এক দিন আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প রাশিয়াকে একটি আলটিমেটাম দেন। যেখানে ট্রাম্প বলেন, যদি ৮ আগস্টের (শুক্রবার) মধ্যে রাশিয়া একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়, তবে তিনি দেশটির ওপর একগুচ্ছ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন।
পরদিন গতকাল শনিবার মেদভেদেভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্পের আলটিমেটামকে ‘যুদ্ধের দিকে একটি পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি লেখেন, ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে আলটিমেটাম দেওয়ার খেলা খেলছেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, ‘শব্দ খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক সময়ই তা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। আমি আশা করি, এবার তেমন কিছু হবে না।’
ট্রাম্প কী করেছেন
শুক্রবার ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, তিনি দুটি মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিনকে ‘উপযুক্ত স্থানে’ মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
কারণ, সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট ও বর্তমানে রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান মেদভেদেভের কিছু মন্তব্যকে ট্রাম্প হুমকি বলে মনে করছেন। তিনি মেদভেদেভের বক্তব্যকে ‘চরম উসকানিমূলক’ বলে আখ্যায়িত করেন। বলেন, তাঁর (ট্রাম্পের) নেওয়া পদক্ষেপ সতর্কতামূলক।
ট্রাম্প তাঁর পোস্টে আরও লেখেন, ‘এ বোকামিপূর্ণ ও উসকানিমূলক বক্তব্য শুধু যদি কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে...তাই আমি দুটি পারমাণবিক সাবমেরিন উপযুক্ত অঞ্চলে মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছি।’
ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারকালে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একাধিক দফায় আলোচনার পরও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো ফলাফল আসেনি।
ট্রাম্পের মোতায়েন করা সাবমেরিন সম্পর্কে যা জানা যায়
ট্রাম্প কোন সাবমেরিনের কথা বলেছেন, সে সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য নেই। তিনি পারমাণবিক শক্তি চালিত সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন, নাকি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী সাবমেরিনের কথা বলেছেন, তা–ও পরিষ্কার নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট
ট্রাম্প সাবমেরিনগুলোর অবস্থানও প্রকাশ করেননি। মার্কিন সামরিক প্রটোকল অনুযায়ী সাবমেরিনের অবস্থান প্রকাশ করা যায় না। এ নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাশিয়ার কাছে সাবমেরিন মোতায়েনের নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প আসলে সামরিক হুমকি দেননি; বরং এটা কথার লড়াই বা কৌশলগত হুমকি। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই মোতায়েন করা এমন পারমাণবিক সাবমেরিন রয়েছে, যেগুলো রাশিয়ায় হামলা চালাতে সক্ষম।
কী কারণে ট্রাম্প সাবমেরিন মোতায়েনের কথা বললেন
মূলত, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতির অভাবে ট্রাম্প হতাশ হয়ে পড়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে মেদভেদেভের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হওয়া বাগ্বিতণ্ডাই সম্ভবত তাঁকে এ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।
কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ও মেদভেদেভের মধ্যে কাদা–ছোড়াছুড়ি চলছে। এর আগে, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্প যে নতুন সময়সীমা (৮ আগস্ট) নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তার জবাবে মেদভেদেভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে লেখেন, ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে ‘আলটিমেটামের খেলা খেলছেন’।
মেদভেদেভ লেখেন, ‘প্রতিটি নতুন আলটিমেটামই এক একটি হুমকি এবং যুদ্ধের দিকে একটি পদক্ষেপ। (এ যুদ্ধ) রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নয়; বরং তাঁর নিজের দেশের সঙ্গে। ঘুমকাতুরে জো–এর পথে হাঁটবেন না।’
এখানে ঘুমকাতুরে জো বলতে মেদভেদেভ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। প্রায় তিন বছর আগে রাশিয়া হামলা করার পর বাইডেন দৃঢ়ভাবে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইউক্রেনকে সব ধরনের সহায়তা করেছেন।
এ সপ্তাহের শুরুতে ভারতের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখায় ভারতের বিরুদ্ধে বাড়তি একটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলেছেন তিনি। এসব ঘোষণা দেওয়ার সময় ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, যদি ভারত ও রাশিয়া তাদের মৃতপ্রায় অর্থনীতি একসঙ্গে ধ্বংস করতে চায়, তাতে তাঁর কিছু আসে যায় না।
এর আগে বৃহস্পতিবার টেলিগ্রামে এক পোস্টে মেদভেদেভ লেখেন, ‘ট্রাম্পের উচিত জম্বিভিত্তিক তাঁর প্রিয় সিনেমাগুলো আবার দেখা এবং মনে করা যে কল্পিত ‘‘ডেড হ্যান্ড’’ ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে।’
রাশিয়ার ডেড হ্যান্ড সিস্টেম হলো স্নায়ুযুদ্ধ যুগের একটি স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা, যা এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যে যদি শত্রুর প্রথম হামলাতেই রুশ নেতৃত্ব সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, তবু এটি পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম
বিশ্বে মোট পারমাণবিক অস্ত্রের ৮৭ শতাংশই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অস্ত্রাগারে। এ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রায় ৮৩ শতাংশ পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে, যা বাস্তবে মোতায়েন করা বা সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
আমেরিকান সায়েন্টিস্টস ফেডারেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী এখনো ‘খুবই উচ্চ মাত্রায়’ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।